লেখক তার স্মৃতির পাতা উল্টিয়ে দেখেন শৈশবের মামাবাড়ির দিনগুলো। স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষের অপেক্ষা থাকত খুলনার উদ্দেশে রওনা হওয়ার জন্য। সেই যাত্রাপথ ছিল যেন এক উৎসব—প্রথমে লঞ্চে পিরোজপুর, তারপর বাসে বাগেরহাট হয়ে রূপসা। কাউখালী ঘাটে সাগর কলার মিষ্টি ঘ্রাণ আজও ভুলতে পারেননি তিনি। খুলনায় বড় মামার বাসায় পৌঁছেই নাকে আসত ধোঁয়া ওঠা মুরগির মাংসের গন্ধ। মা হাতে তৈরি পিঠা নিয়ে যেতেন। বড় মামার বাসা ছিল লোকজনে ঠাসা, বড় বড় পাতিলে রান্না হতো। লাজুক স্বভাবের লেখক মামির ঘরের পাশে বোনদের গল্প শুনতেন চুপচাপ। মামির ঘর ছিল প্রাণকেন্দ্র, যেখানে সবাই জড়ো হতেন গল্প, হাসি-ঠাট্টায়।
মেজ মামার বাসায় বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে দূরের খুলনা শহর দেখা যেত। লিনি আপু ও মামুন ভাইয়ের সঙ্গে ক্যারম খেলা হতো। মামুন ভাই সাইকেল চালালে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতেন লেখক। পড়াশোনায় কড়া থাকলেও মেজ মামার মমতা ছিল গভীর। আজ লেখক অনুভব করেন, মামার স্বপ্ন পূরণে নিজের জায়গা থেকে লড়াই করছেন। সেজ মামার বাসা ছিল খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছে, গাছপালায় ঘেরা শান্ত পরিবেশ। পেয়ারা গাছের ডালে উঠে পেয়ারা খাওয়ার সময় এক অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে পেয়ারা চায়। কয়েকটি ছুড়ে দিলে সে হেসে চলে যায়। আর কখনও দেখা হয়নি—সে যেন শৈশবের আকাশে ভেসে যাওয়া ক্ষণিক মেঘ।
ছোট মামার ছেলে ইমনের সঙ্গে বয়সের ব্যবধান মাত্র ছয় মাস, যদিও লেখক দেড় বছর বলে দাবি করতেন। সেই বাড়ির ছাদে পাটি বিছিয়ে জ্যোৎস্না দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়া, মাসুদ রানা-তিন গোয়েন্দা নিয়ে আলোচনা—কত স্মৃতি! এক বৃষ্টির রাতে ছাদে ঘুমিয়ে ভিজে যাওয়ার ঘটনা আজও হাসি পায়। সৌদি আরব থেকে ছোট মামার আনা খেলনা বন্দুক ছিল সবচেয়ে দামি সম্পদ।
নীলা আপার অপূর্ব সৌন্দর্য ও মিশুক স্বভাব ছিল সবার প্রিয়। হঠাৎ তাঁর মৃত্যুতে লেখক প্রথম মৃত্যুর নির্মমতা উপলব্ধি করেন। কখনও কখনও কিছু দুঃখ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, নীরবে বুকে জমে থাকে। খুলনার চওড়া রিকশা ও ভয়ংকর মশাও স্মৃতির অংশ।
লেখক মনে করেন, মানুষ জায়গাকে নয়, বরং জায়গার মানুষগুলোকে ভালোবাসে। মানুষগুলো একে একে চলে গেছেন, বাড়ি ফাঁকা। তবু ভালোবাসা স্মৃতিতে চিরজীবী থাকে। মামাতো বোন রিমির পিএইচডি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার অর্জনে তিনি গর্বিত। মামা-মামি, মামাতো ভাই-বোনদের প্রতি রইল অশেষ ভালোবাসা ও শুভকামনা।




