বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীদের টেনে আনা যে অসম্ভব, পাঁচ বছর আগে এমনটাই মনে করতেন বিলিয়নিয়ার বিনিয়োগকারী বিল অ্যাকম্যান। কিন্তু এখন তার ধারণা বদলে গেছে। তিনি মনে করছেন, ক্ষমতার ভারসাম্য এখন অন্য দিকে হেলে পড়েছে। ডিজাইনার ও উদ্যোক্তা তার স্ত্রী নেরি অক্সম্যানের সঙ্গে মিলে ম্যানহাটনে ‘অ্যাকম্যান অক্সম্যান ইনস্টিটিউট’ (এওআই) নামে একটি নিউরোসায়েন্স ও দীর্ঘায়ু গবেষণা কেন্দ্র চালু করছেন তারা।

গত ১৯ আগস্ট এক্স-এ দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে অ্যাকম্যান জানান, এই প্রতিষ্ঠানের মূল ভিত্তি হিসেবে তারা পার্শিং স্কয়ার স্টকের প্রায় ৪০ কোটি ডলার দান করছেন। এর পাশাপাশি সমান বা তার চেয়েও বড় আরেকটি অনুদান আসবে বলেও জানান তিনি। ‘বিশ্বের সেরা মস্তিষ্ক গবেষণা, পুনর্বাসন, পুনরুদ্ধার, মানব উন্নয়ন ও দীর্ঘায়ু ইনস্টিটিউট গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য,’ লেখেন অ্যাকম্যান।

এই প্রকল্প মূলত মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের উপর একটি বাজি, তবে একইসাথে এটি ধারণা দেয় যে শীর্ষস্থানীয় গবেষকদের আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে। অ্যাকম্যান জানান, অর্ধ দশক আগে তারা একটি মস্তিষ্ক ইনস্টিটিউট গড়ার কথা ভেবেছিলেন। অক্সম্যানের মা যিনি আলঝেইমারে মারা গিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন এই ভাবনার অনুপ্রেরণা। তবে নিউ ইয়র্কের রিয়েল এস্টেটের উচ্চ মূল্য এবং ‘বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেরা প্রতিভাদের আমাদের কাজে যুক্ত করা অত্যন্ত কঠিন হবে’ বলে তখন তারা সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে বলে মনে করছেন তিনি। প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় রিয়েল এস্টেট ৭০ শতাংশ ছাড়ে পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, ক্যাম্পাসের রাজনীতি, ইহুদিবিদ্বেষ ও ক্রমহ্রাসমান তহবিলের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন ‘কাজ করার জন্য অনেক কম আকর্ষণীয় জায়গা’ হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এই বক্তব্য অ্যাকম্যানের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়েরই অংশ। হার্ভার্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লডিন গেকে সরানোর চাপ সৃষ্টিতে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টির ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলার সমালোচনা করেছিলেন, এর ডিইআই নীতিতে আক্রমণ করেছিলেন এবং পরে হার্ভার্ডের বেশ কয়েকজন বোর্ড সদস্যকে অপসারণেরও দাবি জানিয়েছিলেন।

অ্যাকম্যানের পোস্টে বিজ্ঞানীরা ব্যাপক হারে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যাচ্ছেন— এমন কোনো তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। তবে তার নতুন ইনস্টিটিউট এমন ধারণার উপর ভিত্তি করে গঠিত হচ্ছে যে শীর্ষ গবেষকদের ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার বাইরে কাজ করতে রাজি করানো যেতে পারে। এওআই হবে ‘রোগীকেন্দ্রিক’ এবং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে চিকিৎসায় রূপান্তরের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে। অ্যাকম্যানের ভাষ্যমতে, এটি এমন একটি একাডেমিক ইনস্টিটিউট হবে না যেখানে প্রচুর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হবে কিন্তু রোগীদের জন্য কোনো ফলাফল থাকবে না। এর পরিবর্তে, গবেষণা থেকে নিরাময়, চিকিৎসা ও ডিভাইস তৈরির পথ দ্রুততর করাই হবে এর মূল লক্ষ্য।

‘আপনার যদি বিধ্বংসী মস্তিষ্কের আঘাত থাকে, তবে এখনই ইতিহাসের সেরা সময়। আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি যেখানে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে অন্ধরা শীঘ্রই আবার দেখতে পাবে,’ লেখেন অ্যাকম্যান। ‘আমরা সেটা ঘটাতে সম্ভব সবকিছু করব, যার মধ্যে রয়েছে এই খাতে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করাও।’ এওআই অলাভজনক হলেও এটির ‘অত্যন্ত বাণিজ্যিক প্রবৃত্তি’ থাকবে বলেও জানান তিনি। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব ভেঞ্চার ফান্ডিং কার্যক্রম পরিচালনা করবে, সেখানে উদ্ভাবিত প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে কোম্পানি তৈরি করবে এবং সেই আর্থিক রিটার্ন গবেষণায় পুনর্বিনিয়োগ করবে।

প্রকল্পটির বিশাল ভৌত অবকাঠামোও রয়েছে। মে মাসে একজন রিয়েল এস্টেট সহকর্মী সম্পত্তিটির কথা জানানোর পর পার্শিং স্কয়ার ফাউন্ডেশন ম্যানহাটনের ওয়েস্ট সাইডে প্রায় খালি পড়ে থাকা ৪০০,০০০ বর্গফুটের একটি বায়োটেক সুবিধা কিনে নেয়। পাশের ১৩০,০০০ বর্গফুটের একটি ভবনও অধিগ্রহণের চুক্তি আছে এবং সংলগ্ন একটি খালি জায়গাও কেনা হচ্ছে। বর্তমান জোনিং আইনে অতিরিক্ত নির্মাণের অনুমতি থাকায় ক্যাম্পাসটি ৬৮০,০০০ বর্গফুটে পৌঁছতে পারে— যা রকফেলার ইউনিভার্সিটির গবেষণাগারের চেয়েও বড়। নিউরোসায়েন্স, পুনর্বাসন, পুষ্টি, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও দীর্ঘায়ু গবেষণা— সবকিছু একই ক্যাম্পাসে একীভূত হবে। মাউন্ট সিনাইকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সীমানা পেরিয়ে কাজ করতে চান অ্যাকম্যান। ‘আমরা বিশ্বাস করি না যে কোনো প্রতিষ্ঠানেরই সেরা ধারণা বা সেরা প্রতিভার উপর একচেটিয়া অধিকার আছে,’ লেখেন তিনি।

এই প্রকল্পের জন্ম একটি পারিবারিক সংকট থেকে। তার ২৬ বছর বয়সী মেয়ে লুসির মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয় এবং ব্রুকলিনের অ্যাপার্টমেন্টে অচেতন অবস্থায় পাওয়ার পর জরুরি অস্ত্রোপচার করতে হয়। এক্স পোস্টে অ্যাকম্যান লেখেন, মাসব্যাপী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন তাদের পরিবারকে মস্তিষ্কের পুনরুদ্ধার ক্ষমতা এবং বর্তমান চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা— দুইটাই উপলব্ধি করিয়েছে। ‘আকর্ষণীয় বিষয় হলো, আমার জীবনে এখন পর্যন্ত যা কিছু করেছি, সবই তাকে সাহায্য করার জন্য আমাকে প্রস্তুত করেছে,’ তিনি আগে ফরচুনকে বলেছিলেন। ডাক্তারদের লুসির চোখে মাইটোকন্ড্রিয়া ইনজেকশনের মতো অভিনব চিকিৎসা চেষ্টা করতে উৎসাহিত করার কথাও তিনি জানান। তার চিকিৎসা থেকে পাওয়া অন্তর্দৃষ্টির ভিত্তিতেই এওআই গড়ে উঠবে বলেও জানান তিনি।

অ্যাকম্যান এআই এবং মস্তিষ্ক-কম্পিউটার ইন্টারফেসকে এওআই-এর মূল মিশন হিসেবে দেখছেন। নিউরালিংক, প্রিসিশন নিউরোসায়েন্স এবং সিঙ্ক্রোনের মতো কোম্পানিতে তৈরি হচ্ছে এমন মস্তিষ্ক-কম্পিউটার সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে লুসির। তার নতুন ইনস্টিটিউট ‘মস্তিষ্ক এবং এআই-এর মধ্যে মিথস্ক্রিয়ার অগ্রভাগে’ থাকা উচিত বলে যুক্তি দেন তিনি। অক্টোবরের মধ্যে একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগের আশা করছেন অ্যাকম্যান। প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, প্রধান এআই ও প্রযুক্তি কর্মকর্তাসহ অন্যান্য সিনিয়র নেতৃত্বের পদও পূরণ করা হচ্ছে। বোর্ডে রয়েছেন উদ্ভাবক ডিন কামেন, রিজেনারনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জর্জ ইয়ানকোপোলোস, নোবেল বিজয়ী জৈব রসায়নবিদ জেমস রথম্যান, নিউরোসায়েন্টিস্ট বার্নার্ডো সাবাতিনি, নিউরোসার্জন ক্রিস কেলনার, পার্শিং স্কয়ার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অলিভিয়া ফ্ল্যাটো, অক্সম্যান এবং অ্যাকম্যান নিজে। ‘লুসির কাছ থেকে আমরা শিখেছি যে এমনকি বিপর্যয়কর আঘাত থেকেও মস্তিষ্ক পুনরুদ্ধার হতে পারে,’ লেখেন তিনি। ‘মনকে নষ্ট করা ভয়ানক, তাই আরও অনেক কাজ বাকি।’