ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি শিশুর খাতা উদ্ধার হয়েছে। খাতার পাতাগুলো অক্ষত, পরিপাটি হাতের লেখায় ভরা। প্রচ্ছদে লেখা নাম—মাহিয়া সালারি। বয়স ছিল মাত্র আট বছর। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এই স্কুলে ১৫৬ জন নিহত হয়েছিলেন, যাদের ১২০ জনই শিশু। পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো এক শিশুর মরদেহ খোঁজা হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক আমাইনে নাদেমি বলেন, 'এটিকে আর স্কুল বলা যায় না। এখানে শুধু দেয়ালগুলো দাঁড়িয়ে আছে, যেগুলো থেকে মৃত্যু, শোক আর রক্তের গন্ধ ভেসে আসে।' হামলার পর শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের খালি পায়ে ছুটে আসার স্মৃতি মনে করে তিনি বলেন, 'আমি ভেবেছিলাম, সবাই বেরিয়ে গেছে। আমি জানতাম না, তারা সবাই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।' মাহিয়া তার ছোট ভাই আলীকে নিয়ে স্কুলে ছিল; হামলার আগে তাদের মা স্কুলে গিয়েছিলেন তাদের নিতে। হামলায় তিনজনই প্রাণ হারান।
মিনাব শহরজুড়ে দেয়াল, দোকানের শাটার আর বিলবোর্ডে মৃত মানুষের ছবি টাঙানো। শহরটি যুদ্ধে সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। কবরস্থানে সারিবদ্ধ ছোট ছোট কবরের মাঝে ৯ বছর বয়সী মেয়ে সেতায়েশকে হারানো মাসুমেহ মেহরান শেখাবাদি প্রায় প্রতিদিন আসেন। তিনি বলেন, 'আমি যখন সেখানে পৌঁছাই, তখন শুধু ধোঁয়া আর শিশুদের চুলের গন্ধ। আমি একটি হাত দেখেছিলাম। একটি পা দেখেছিলাম। তাদের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।'
মিনাবের পশ্চিমে বন্দর আব্বাস ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক বন্দর ও হরমুজ প্রণালির মূল প্রবেশদ্বার। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। যুদ্ধের কারণে শহরটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক নিশানায় পরিণত হয়েছে; ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিলের মধ্যে কমপক্ষে ৯৬টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। কয়েক মাসের অচলাবস্থায় জেলেসহ অনেকের রোজগার বন্ধ।
তেহরান থেকে বন্দর আব্বাসগামী রাতের ট্রেনে উঠেছিলেন শিক্ষার্থী, ফুটবলার, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পরিবার। ট্রেনের কামরায় আলাপকালে আইনজীবী আজাদেহ বলেন, 'মানিয়ে নেওয়া প্রত্যেক ইরানির স্বভাবের মধ্যে রয়েছে। আমরা আমাদের জীবন চালিয়ে যাওয়ার, দৈনন্দিন রুটিন বজায় রাখার এবং আশাবাদী থাকার চেষ্টা করেছি।' রূপচর্চাবিশেষজ্ঞ সেপিদেহ বলেন, 'আমি ইরানকে ভালোবাসি। ভীষণ ভালোবাসি। কিন্তু যখন দেখি আমার তারুণ্য ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং আমার স্বপ্নগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, তখন (দেশ ছেড়ে) চলে যাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো উপায় থাকে না।'
তরুণ ফুটবলার আবদুল্লাহ যুদ্ধের স্মৃতি মনে করে বলেন, 'তারা (যুক্তরাষ্ট্র) শিশুভর্তি একটি স্কুলে হামলা করেছিল…তাদের বয়স ছিল ৭, ৮ ও ৯ বছর। পুরো দেশ শোকে ভেঙে পড়েছিল। জানাজার দিন…সবাই কেঁদেছিল।' একসময় সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নামা এক ব্যক্তি বলেন, 'আমি যুদ্ধ মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু নিরপরাধ মানুষ হত্যার বিনিময়ে নয়। যুদ্ধ সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। এটি ভালো মানুষ আর খারাপ মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না।'
চলতি বছরের শুরুতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে ক্ষোভের আগুন জ্বললেও যুদ্ধ শুরুর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। তেহরানে ফিরে এসে দেখা যায়, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় লাখো মানুষ অংশ নিয়েছেন। 'আমেরিকার মৃত্যু' ও 'ইসরায়েলের মৃত্যু' স্লোগানে মুখরিত ছিল সড়ক। জীবনে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক মিছিলে অংশ নেওয়া সুরাইয়া বলেন, 'আমি এমন অনেক মানুষকে চিনি, যাঁরা সরকারের বিরোধিতা করতেন।...আজ তাঁরা সরকারকে সমর্থন করছেন।' তবে এই পরিবর্তন কি টেকসই? যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ায় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত কী উত্তরাধিকার রেখে যাবে।




