একটি ধর্মীয় বিশ্লেষণে ইসলামের পরিভাষায় রিজিকের প্রকৃত উৎস নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। মুফতি ইউসুফ এমদাদী, যিনি ঢাকার মারকাযু ফয়জিল কুরআন আল-ইসলামীর শিক্ষক, তিনি তার লেখায় দেখিয়েছেন যে মহাবিশ্বের প্রতিটি সৃষ্টি তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বাহ্যিক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল। ইসলামে এই জীবনধারণের উপাদানকে ‘রিজিক’ বলা হয়।
মানুষ নিজের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে রিজিক উপার্জন করছে বলে মনে হলেও, কার্যকারণের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় মানুষের প্রচেষ্টা কেবল একটা বাহ্যিক মাধ্যম; রিজিকের প্রকৃত উৎস আল্লাহ। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মানুষের বাহ্যিক চেষ্টার নিজস্ব কোনো স্বাধীন ক্ষমতা নেই, যা অবলম্বন করলেই রিজিকপ্রাপ্তি নিশ্চিত হবে। যদি তা-ই হতো, তবে কোনো পরিশ্রম কখনো বৃথা যেত না।
একজন কৃষকের উদাহরণ টেনে লেখক ব্যাখ্যা করেছেন যে কৃষক মাটিতে বীজ বপন করেন; কিন্তু সেই নিষ্প্রাণ বীজে প্রাণ সঞ্চার করা, কোষ বিভাজনের মাধ্যমে চারাগাছে রূপান্তরিত করা, নির্দিষ্ট নিয়মে ফলের জিনগত কোড সক্রিয় রাখা—এতে কৃষকের কোনো অবদান নেই। উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণের জন্য দরকার সূর্যের আলো, মাটির খনিজ আর সঠিক জলবায়ু। এই পুরো মহাজাগতিক ব্যবস্থাটা মানুষ তৈরি করেনি। মানুষ কেবল তৈরি উপাদান ব্যবহার করে মাত্র।
ইসলামে ধনসম্পদকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়, সে প্রসঙ্গেও আলোচনা করা হয়েছে। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেছেন, ‘হে আমার বান্দাগণ, আমি যাকে অন্ন দিয়েছি সে ছাড়া তোমরা সবাই ক্ষুধার্ত। সুতরাং তোমরা আমার কাছে খাদ্য চাও, আমি তোমাদের খাদ্য দেব।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৭৭) লেখকের মতে, এই একটি বাক্যেই রিজিকের পুরো দর্শন এসে যায়।
আল্লাহর রিজিকদাতা হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ তার সর্বজনীনতা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে তিনি কেবল বিশ্বাসীদের নয়, যারা তাকে অস্বীকার করে তাদেরও জীবনোপকরণ দেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহ নেননি।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৬)
আধুনিক প্রযুক্তি, নিখুঁত পরিকল্পনা আর সর্বোচ্চ পরিশ্রমের পরেও একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অনাবৃষ্টি বা বন্যায় কোটি কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়ে যায়। রিজিকের সমীকরণে এমন বহু বিষয় আছে, যা সম্পূর্ণ মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এই অনিয়ন্ত্রিত বিষয়গুলো যাঁর ইশারায় পরিচালিত হয়, যুক্তির বিচারে তিনিই রিজিকের প্রকৃত মালিক।
মানুষের সাধারণ দুর্বলতা হলো, অভাব বা কষ্টের মুহূর্তে সে অধৈর্য হয়ে পড়ে এবং ভাবে আল্লাহ তাকে ছেড়ে দিয়েছেন। পবিত্র কোরআন এই মনস্তত্ত্ব তুলে ধরেছে: ‘মানুষের অবস্থা এই যে যখন তার প্রতিপালক তাকে মর্যাদা ও অনুগ্রহ দান করেন, তখন সে বলে, আমার প্রতিপালক আমাকে সম্মানিত করেছেন। আর যখন তার রিজিক সংকুচিত করে দেন, তখন সে বলে, আমার প্রতিপালক আমাকে হেয় করেছেন।’ (সুরা ফাজর, আয়াত: ১৫-১৬) লেখকের মতে, এই দুটো প্রতিক্রিয়াই আসলে অপরিপক্ব। প্রাচুর্য মানে আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর সংকট মানে তার বিরাগ—এই ভাবনা সঠিক নয়। সংকট অনেক সময় আল্লাহর একটা পরীক্ষা, যেখানে তিনি দেখতে চান বান্দা তার দিকে রুজু করে কি না।
সারকথা: যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও দর্শন—সব পথ শেষ পর্যন্ত একটি জায়গায় এসে মেলে: মানুষ রিজিকের সংগ্রাহক হতে পারে, কিন্তু স্রষ্টা নয়। এই সত্যটা উপলব্ধিতে এলে আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে, আর সেই নির্ভরতাই মুমিনের মানসিক প্রশান্তির মূল উৎস বলে মন্তব্য করেছেন মুফতি ইউসুফ এমদাদী।
