কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত একটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহে তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত টার্মিনালটিতে আগুন লাগার পর থেকে পরিস্থিতি প্রতিদিনই খারাপ হচ্ছে, আর নগরবাসীকে চরম ভোগান্তির মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।
সরবরাহের চরম ঘাটতির কারণে আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি শিল্প ও ক্যাপটিভ পাওয়ার খাতে গ্যাসের চাপ কমিয়ে দিয়েছে কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি (কেজিডিসিএল)। প্রভাব পড়েছে নগরীর প্রায় সব এলাকায়। হালিশহর এলাকার বাসিন্দা শিরিন আক্তারের ভাষ্যে, সকাল ১০টার মধ্যেই গ্যাসের চুলা নিভে যায়। তারপর শুরু হয় অনির্দিষ্টকালের অপেক্ষা। বেলা তিনটার দিকে গ্যাস এলেও তাতে চাপ থাকে খুবই কম। তিনি জানান, পানি ফোটাতেই বিস্তর সময় লেগে যায়, ফলে রান্না শেষ করতে বিকেল হয়ে যায়। এই অনিশ্চয়তা ও দুর্বল চাপের সমস্যা গত এক সপ্তাহ ধরেই চলছে।
কেজিডিসিএলের হিসাব বলছে, একটি নির্দিষ্ট ২৪ ঘণ্টায় প্রতিষ্ঠানটির কাছে গ্যাসের চাহিদা ছিল প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট। কিন্তু এর বিপরীতে তারা পেয়েছে মাত্র ২৩ কোটি ঘনফুট, যা চাহিদার ৬৬ শতাংশ। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ কোটি ঘনফুটে। সংস্থাটির এক কর্মকর্তার সতর্কবার্তা, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল চালু না হলে সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে, যা চট্টগ্রামের ভোগান্তির মাত্রা বাড়িয়ে দেবে।
জ্বালানি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহ প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর। এগুলোর একটি সামিট এবং অন্যটি এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালনাধীন। এই দুই উৎস থেকে জাতীয় গ্রিড হয়ে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস আসতো। এক্সিলারেটের টার্মিনালে আগুনের পর সরবরাহ কমে ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে আসে, যার প্রত্যক্ষ ধাক্কা লাগে চট্টগ্রামে। এ ধরণের সমস্যা প্রতিবছরই কোনো না কোনো কারণে দেখা দেয়, কিন্তু কার্যকর পূর্বপ্রস্তুতি বা সতর্কতার ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। বর্তমান সংকটেও কেজিডিসিএলের ওয়েবসাইটে কোনো সতর্কতা প্রকাশ করা হয়নি।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, কোনো পূর্বাভাস না থাকায় হঠাৎ গ্যাস চলে যাওয়ার পরই কেবল তারা সংকটের কথা টের পান। আগ্রাবাদ, হালিশহর, বহদ্দারহাট, পতেঙ্গাসহ একাধিক এলাকায় সকাল থেকে গ্যাসহীন থাকতে হয়, কোথাও আবার বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটির পরিচালনাকারী এক্সিলারেট এনার্জি সম্পূর্ণ সচল করতে ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় নিয়েছে। তবে এই সংকট কিছুটা লাঘবে ভোলা যাচ্ছে অক্ষত বয়লারটি চালুর প্রচেষ্টায়। পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বয়লার থেকে গ্যাস সরবরাহ পুনরায় শুরু করা গেলে দৈনিক ৩০ কোটি ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে এসে পৌঁছেছে এবং বিদেশি ও দেশীয় প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ দল কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে কবে নাগাদ এটি সচল হবে, সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে অক্ষত বয়লার চালুর চেষ্টা চলছে। বর্তমানে অপর টার্মিনাল থেকে প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামে এই গ্যাস-সংকট পুরোপুরি কাটবে না।




