মানুষ যখন একটি মানবসদৃশ রোবটের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে এবং সেই রোবটটি ভুল করে, তখন তার প্রতি মানুষের সন্দেহ বেড়ে যায়, বিশেষ করে যদি রোবটটি অভিব্যক্তিপূর্ণ হয়। ‘সায়েন্স রোবোটিকস’ জার্নালে প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকরা ৫০ জন অংশগ্রহণকারীকে বাণিজ্যিক মানবসদৃশ রোবট ‘পেপার’-এর সঙ্গে কথোপকথন ও যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজে যুক্ত করেন। পেপার রোবটটি অভিব্যক্তিপূর্ণ এবং আবেগ শনাক্ত করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
কখনও রোবটটি সঠিক পরামর্শ দিত, আবার কখনও এটি কথোপকথনে ভুল করত—যেমন বাধা দেওয়া বা অযৌক্তিক প্রস্তাব দেওয়া। কিছু অংশগ্রহণকারীর জন্য রোবটটি অ্যানিমেটেড ছিল, অঙ্গভঙ্গি, চোখের যোগাযোগ ও মাথা নাড়ানোর মাধ্যমে নিজের ভাব প্রকাশ করত; অন্যদের জন্য এটি সম্পূর্ণ নিশ্চল ছিল। গবেষকরা চারটি বিষয় পরিমাপ করেন: মস্তিষ্কের কার্যকলাপ, অক্সিটোসিন হরমোনের মাত্রা, অংশগ্রহণকারীদের স্ব-প্রতিবেদিত আস্থা এবং রোবটের প্রভাব পর্যবেক্ষণ।
গবেষণায় দেখা যায়, যখন মানুষ অভিব্যক্তিপূর্ণ রোবটের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে এবং রোবটটি সামাজিক নিয়ম ভঙ্গ করে, তখন তাদের অক্সিটোসিনের মাত্রা বেড়ে যায়। অক্সিটোসিন সাধারণত ‘প্রেম হরমোন’ নামে পরিচিত, যা সামাজিক বন্ধনে ভূমিকা রাখে। সাধারণ ধারণা অনুযায়ী, সঙ্গী হতাশ করলে এই হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখানে দেখা গেছে, অভিব্যক্তিপূর্ণ রোবটের ভুলের সময় অক্সিটোসিনের মাত্রা যত বেশি বেড়েছে, অংশগ্রহণকারীরা তত কম আস্থা রেখেছে এবং রোবটের পরামর্শ কম গ্রহণ করেছে। প্রকৃতপক্ষে, হরমোনটি স্নেহের পরিবর্তে সন্দেহের সূচক হিসেবে কাজ করছে।
ভুল যে কোনো রোবটের ক্ষেত্রেই আস্থা ও প্রভাব কমিয়ে দিয়েছে, রোবটটি অভিব্যক্তিপূর্ণ হোক বা না হোক। তবে অভিব্যক্তিপূর্ণ রোবটের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন ছিল। প্রচলিত পদ্ধতিতে বাস্তব কথোপকথনের সময় মস্তিষ্ক পড়া কঠিন, কারণ এজন্য এমআরআই স্ক্যানারে নিশ্চল হয়ে শুয়ে থাকতে হয়। তাই গবেষকরা ‘ফাংশনাল নিয়ার-ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি’ নামে একটি পোর্টেবল সেন্সর ব্যবহার করেন, যা কপালে পরা যায় এবং চলাফেরা ও স্বাভাবিক কথোপকথনের সময় মস্তিষ্কে অক্সিজেনের মাত্রা ট্র্যাক করে।
গবেষকরা দুটি মস্তিষ্ক অঞ্চলের দিকে নজর রাখেন: ডরসোল্যাটারাল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স এবং মিডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স। প্রথমটি অনিশ্চয়তা পর্যবেক্ষণ করে এবং প্রত্যাশা বা নিয়ম ভঙ্গ হলে তা চিহ্নিত করে; দ্বিতীয়টি ‘মেন্টালাইজিং’-এ সহায়তা করে, অর্থাৎ অন্যের উদ্দেশ্য অনুমান করার কাজে ভূমিকা রাখে। যখন অ্যানিমেটেড রোবট ভুল করত, অংশগ্রহণকারীরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ত এবং অস্বস্তিকর সামাজিক পরিস্থিতি বোঝার জন্য বেশি চেষ্টা করতে হতো। মস্তিষ্কের দুটি অঞ্চলের কার্যকলাপ বেড়ে যায় এবং তারা আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে শুরু করে। এই সমন্বিত কার্যকলাপ অক্সিটোসিনের মাত্রা বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়, যা শেষ পর্যন্ত আস্থা ও রোবটের প্রভাব কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে, অভিব্যক্তিহীন রোবটের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়াকারীদের ক্ষেত্রে এই সমন্বিত মস্তিষ্ক কার্যকলাপ দেখা যায়নি।
গবেষকদের মতে, মানবসদৃশ রোবট যখন বাড়ি, নার্সিং হোম ও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে, তখন মানুষের প্রতিক্রিয়া বোঝা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একটি সাধারণ ধারণা ছিল যে জীবনসদৃশ, সামাজিকভাবে অভিব্যক্তিপূর্ণ রোবট বেশি আস্থা অর্জন করে এবং ভুল করলেও তার ‘সুনাম’ রক্ষা পায়। তবে এই গবেষণা দেখায় যে ধারণাটি ভুল। অভিব্যক্তিপূর্ণ সংকেত মানুষের কাছে ভুলকে প্রযুক্তিগত ত্রুটির পরিবর্তে সামাজিক লঙ্ঘন হিসেবে উপস্থাপন করে, যা মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করে।
গবেষণাটি কেবল তরুণ পুরুষদের নিয়ে এবং একটি নির্দিষ্ট রোবট ডিজাইন ব্যবহার করে পরিচালিত হয়েছে। ভবিষ্যতে নারী, মিশ্র দল, অন্যান্য সংস্কৃতি ও ভিন্ন রোবট ডিজাইনের ক্ষেত্রেও একই ফল পাওয়া যায় কিনা তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এছাড়া, রোবটরা ভুল স্বীকার করে, ক্ষমা চেয়ে বা সদিচ্ছা জানিয়ে আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারে কিনা তাও গবেষণার বিষয় হবে।




