সাম্প্রতিক সময়ে বহুল আলোচিত স্পেসএসেক্সের প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আবারও দ্বৈত-শ্রেণীর শেয়ার কাঠামোকে কেন্দ্র করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই কাঠামোর মাধ্যমে কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক প্রায় ৮৫ শতাংশ ভোটাধিকার ধরে রেখেছেন। দ্বৈত-শ্রেণীর শেয়ার নিয়ে কর্পোরেট শাসন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই মতভেদ রয়েছে। অনেকে এটিকে 'এক শেয়ার, এক ভোট' নীতির লঙ্ঘন হিসেবে দেখেন, যা তাদের মতে প্রতিটি কোম্পানির জন্যই আদর্শ হওয়া উচিত। তবে বাস্তব জগতে অনেক সফল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যেমন ডেল টেকনোলজিসের মাইকেল ডেল, বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের ওয়ারেন বাফেট এবং অ্যালফাবেটের সের্গেই ব্রিন ও ল্যারি পেজ, এই কাঠামো ব্যবহার করেই তাদের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন এবং টিকিয়ে রেখেছেন।
বিরোধীদের প্রধান যুক্তি হলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রণকারী শেয়ারহোল্ডারের ভোটাধিকার ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের মধ্যে একটি 'ফারাক' তৈরি হয়। সমালোচকদের মতে, এই ফারাক বাড়লে নিয়ন্ত্রণকারী শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির সম্পদ অপচয় করতে উদ্বুদ্ধ হন। তবে এই যুক্তির পেছনে কর্পোরেট শাসনের ভিত্তি স্থাপনকারী তাত্ত্বিকদের মতামতকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি করেন বিশেষজ্ঞরা। ১৯৩২ সালে অ্যাডলফ বেরলে ও গার্ডিনার মিন্সের লেখা 'দ্য মডার্ন কর্পোরেশন অ্যান্ড প্রাইভেট প্রপার্টি' গ্রন্থে মূলত সতর্ক করা হয়েছিল অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শেয়ারমালিকানা নিয়ে, যা একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের অভাব তৈরি করে। তাদের ভয় ছিল ম্যানেজারিয়াল কর্পোরেশন, যেখানে ক্ষমতাহীন অসংখ্য ছোট শেয়ারহোল্ডার এবং একজন ভাড়াটে নির্বাহী কোম্পানি চালান। বাস্তবে, দ্বৈত-শ্রেণীর শেয়ার কাঠামো ওই সমস্যারই একটি সমাধান হতে পারে, কারণ এটি একটি নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী শেয়ারহোল্ডারের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে, যা ব্যবস্থাপনাকে জবাবদিহির আওতায় রাখে।
এছাড়া, নিয়ন্ত্রণকারী শেয়ারহোল্ডাররা তাদের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব কমিয়ে দিলেও, তারা সাধারণত কোম্পানির সবচেয়ে বড় একক শেয়ারহোল্ডারই থাকেন। তাদের খ্যাতি, উত্তরাধিকার এবং ব্যক্তিগত সম্পদের বিশাল অংশ কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের ওপর নির্ভরশীল থাকে। তাই তাত্ত্বিক মডেল যা বলুক না কেন, বাস্তবে ৫১ শতাংশ থেকে ৪৫ শতাংশ অংশীদারিত্ব কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে তারা কোম্পানির সাফল্যে কম উদ্বুদ্ধ। বরং, অনেক সময় তারা নিজের সম্পদ দাতব্য কাজে ব্যয় করতে চান, যা সমাজের জন্যও কল্যাণকর। কিন্তু কঠোর শাসন নিয়ম এই ধরনের উদারতাকে নিরুৎসাহিত করে।
সমালোচকদের আরেকটি প্রিয় হাতিয়ার হলো নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্বৈত-শ্রেণীর শেয়ার কাঠামো বাতিল করে দেওয়ার 'সানসেট ক্লজ'। তবে, নিয়ন্ত্রণকারী শেয়ারহোল্ডারদের ওপর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা চাপিয়ে দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। ওয়ারেন বাফেটের মতো প্রতিভাবান নেতাকে যদি ১০ বছর পরে নিয়ন্ত্রণ থেকে সরিয়ে দেওয়া হতো, তাহলে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পারত না। তথ্য বলছে, দ্বৈত-শ্রেণীর শেয়ার কাঠামোর অধীনে থাকা সেরা ১০টি কোম্পানির মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি নিয়ন্ত্রণকারী শেয়ারহোল্ডার ২০ বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তাদের দ্বিতীয় দশকের কর্মক্ষমতা প্রথম দশকের চেয়েও ভালো ছিল।
অবশ্য, দ্বৈত-শ্রেণীর শেয়ার কাঠামো সব কোম্পানির জন্য সমানভাবে উপযোগী নয়। সঠিক নেতৃত্ব ও প্রমাণিত সাফল্যের ইতিহাস থাকলেই এটি কার্যকর হয়। সফল উদাহরণগুলোর মধ্যে রয়েছে এমন নিয়ন্ত্রণকারী শেয়ারহোল্ডার যারা প্রমাণিত দক্ষতা রাখেন, দীর্ঘমেয়াদী পুঁজি বরাদ্দের সক্ষমতা রাখেন, স্বল্পমেয়াদী মুনাফার চেয়ে গবেষণা ও উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেন, এবং যোগ্য উত্তরসূরি নির্বাচন করেন। অন্যদিকে, ব্যর্থ উদাহরণগুলোতে দেখা যায় বার্ধক্যজনিত কারণে প্রতিষ্ঠাতা ক্ষমতা ছাড়তে না চাওয়া, কোম্পানির সম্পদ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা, অযোগ্য উত্তরাধিকারীর হস্তক্ষেপ, এবং পরিবারিক দ্বন্দ্ব।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এনরন, ওয়ার্ল্ডকম, লেম্যান ব্রাদার্স, সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক, এফটিএক্স এবং থেরানোসের মতো সবচেয়ে বড় কর্পোরেট পতন ও জালিয়াতির ঘটনাগুলোতে 'এক শেয়ার, এক ভোট' নীতি কার্যকর ছিল, কিন্তু তা তাদের ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে পারেনি। তাই কর্পোরেট শাসনের সমাধান এক-আকার-সবার-জন্য-উপযোগী নয়। প্রকৃত বিচার করা প্রয়োজন নেতৃত্বের গুণাগুণ, শিল্পের গতিবিধি এবং সাফল্যের প্রকৃত রেকর্ডের ভিত্তিতে। তত্ত্ব এবং অভিজ্ঞতার মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে তা নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক খেলায় পরিণত হয়, যা শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থের জন্য বিপজ্জনক।

