আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সোমবার আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর কঠোর আর্থিক নীতি ও সংস্কার এজেন্ডার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, এসব পদক্ষেপ একটি দেশের প্রতি বাজারের আস্থা পুনরুদ্ধার করেছে যা দীর্ঘদিন ধরে সার্বভৌম ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার জন্য পরিচিত ছিল। বুয়েনস আইরেসে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে জর্জিয়েভা বলেন, 'আর্জেন্টিনা এখন অনেক শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, এবং এটি সরকারের কঠোর পরিশ্রম ও আর্জেন্টিনার জনগণের অধ্যবসায় ও ত্যাগের ফল।' তিনি আট বছরের মধ্যে প্রথম আইএমএফ প্রধান হিসেবে আর্জেন্টিনা সফর করছেন।
জর্জিয়েভা উল্লেখ করেন, ২০১৯ সালে আইএমএফ-এর দায়িত্ব গ্রহণের পরই আর্জেন্টিনার ঋণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। তখন প্রশ্ন ছিল দেশটি কি তার ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে পারবে কিনা। তবে বর্তমানে সেই প্রশ্ন আর প্রাসঙ্গিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। আর্জেন্টিনা আইএমএফ-এর কাছে সর্ববৃহৎ ঋণগ্রস্ত দেশ, যার বকেয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫৮ বিলিয়ন ডলার। আগামী বছর থেকে মূল ঋণ পরিশোধের সময়কাল শুরু হবে, যা মিলেইর পুনর্নির্বাচনের প্রচেষ্টার সঙ্গে মিলে যাবে।
দেশটির অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্প্রতি উন্নত হয়েছে। বন্ডের দাম বেড়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি কমেছে। মিলেইর ক্ষমতা গ্রহণের সময় বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি ছিল ২১০ শতাংশ, যা এখন ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। গত সপ্তাহে মুডি'জ আর্জেন্টিনার সার্বভৌম ঋণ রেটিং উন্নত করেছে, এর আগে এসঅ্যান্ডপি ও ফিচ একই পদক্ষেপ নিয়েছিল। জর্জিয়েভা বলেন, 'আজ আমরা অনেক স্বাস্থ্যকর চিত্র দেখতে পাচ্ছি। বাজারের আস্থা ফিরে এসেছে।'
জর্জিয়েভা মঙ্গলবার ভাকা মুয়ের্তা সফর করবেন, যা বিশ্বের বৃহত্তম অপ্রচলিত তেল ও গ্যাস মজুদের একটি। এই মজুদের উন্নয়ন আগামী বছরগুলিতে আর্জেন্টিনার বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে আইএমএফ-এর কাছ থেকে অতিরিক্ত কোনো অর্থ প্রদানের প্রয়োজন দেখছেন না। 'আর্জেন্টিনা সম্ভবত সেই উদীয়মান বাজারগুলোর ক্লাবে যোগ দিতে পারে যারা আইএমএফ থেকে ঋণ নিয়ে নিজেদের অর্থনীতি সংস্কার করেছে এবং আর ঋণ নেয়নি,' বলেন তিনি।
বিনিয়োগকারীরা আর্জেন্টিনার আগামী ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। সেপ্টেম্বর থেকে দেশটি আইএমএফ-এর মূল ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু করবে, যা সুদ পরিশোধের সঙ্গে যুক্ত হবে। ২০২৭ সালে দেশটির মোট বৈদেশিক মুদ্রা ঋণের বাধ্যবাধকতা তীব্রভাবে বেড়ে যাবে। অর্থমন্ত্রী লুইস কাপুটো বলেছেন, সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে ফিরে না গিয়ে বহুপাক্ষিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে তহবিল, বেসরকারিকরণের আয় ও অভ্যন্তরীণ ঋণের মাধ্যমে এসব পরিশোধের পরিকল্পনা করছে।
তবে অর্থনৈতিক সূচকের উন্নতি সত্ত্বেও মিলেইর জনপ্রিয়তা হ্রাস পাচ্ছে। তার কঠোরতা নীতির কারণে ভোক্তা ব্যয় দুর্বল, মজুরি স্থবির, পরিবারের ঋণ বেড়েছে এবং বেকারত্ব সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে ২০২৭ সালের নির্বাচনে তার পুনর্নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রশাসনের অধীনে তার অর্থনৈতিক সংস্কার অব্যাহত থাকবে কিনা তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এ প্রসঙ্গে জর্জিয়েভা স্বীকার করেছেন, এই ঝুঁকিগুলো মোকাবিলার সর্বোত্তম উপায় হলো 'এখনই শক্তিশালী নীতি তৈরি করা, যা দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করে।' তিনি আরও বলেন, আর্জেন্টিনার এখনো নির্মাণ খাত, ছোট ব্যবসার জন্য ঋণ সম্প্রসারণ, বন্ধকী ঋণ এবং অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান কমানোর মতো ক্ষেত্রে কাজ করার বাকি রয়েছে। ফরচুন ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।




