বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিদেশি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ লেনদেনের মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন রাজস্ব সেবা (আইআরএস) কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে। ওবামা প্রশাসনের সময় থেকে শুরু হওয়া এই তৎপরতার অংশ হিসেবে এখন ইউনাইটেডহেলথ গ্রুপের কর নথির দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবাখাতের এই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের আগস্টের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে, বিদেশি একটি সহযোগী সংস্থার সঙ্গে ২০১৭ থেকে ২০২০ কর বছরের লেনদেনের দাম নির্ধারণ নিয়ে আইআরএস একটি প্রস্তাব দিয়েছে। সংস্থাটি চাইছে, সংশ্লিষ্ট বছরগুলোর জন্য করযোগ্য আয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হোক; পাশাপাশি পরবর্তী বছরগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমন্বয় আনার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে ইউনাইটেডহেলথ এ প্রস্তাবে কোনো ছাড় দিচ্ছে না। কোম্পানির আগস্টের দাখিলকৃত বিবরণীতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তাদের কর সংক্রান্ত অবস্থান যথাযথভাবে সমর্থিত এবং আইআরএসের প্রস্তাবিত সমন্বয়ের বিরুদ্ধে তারা তীব্র প্রতিবাদ জানাবে। এর আগে মে মাসের ত্রৈমাসিক নথিতেও একই বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল। কোনো নির্দিষ্ট সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নাম, তার অবস্থান, সংশ্লিষ্ট লেনদেনের প্রকৃতি কিংবা আইআরএস কী পরিমাণ অর্থ দাবি করছে—এসব বিষয়ে কোনো নথিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি। ফলে এই বিবাদের প্রকৃত পরিসর এখনো অস্পষ্ট।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক রিউভেন এস. আভি-ইওনাহ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যখন তাদের বিদেশি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে মুনাফা স্থানান্তর করে কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন আইআরএস ট্রান্সফার প্রাইসিংয়ের দিকে বিশেষ মনোযোগ দেয়। এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা। তিনি আরও জানান, কোকা-কোলা, মেটা ও মেডট্রনিকের বিরুদ্ধেও সংস্থাটি একই ধরনের লড়াইয়ে নেমেছিল; যদিও ফলাফল ভিন্ন ভিন্ন হয়েছে এবং জড়িত অর্থের পরিমাণ সাধারণত বিলিয়নের ঘরে।

ট্রান্সফার প্রাইসিং কী, তা বুঝতে হলে একটি কোম্পানির বিভিন্ন দেশের নিজস্ব ইউনিটের মধ্যে লেনদেনের মূল্য নির্ধারণের দিকে তাকাতে হয়। এসব দাম কীভাবে ধার্য করা হয়, তার ওপর নির্ভর করে প্রতিটি দেশে কত মুনাফা দেখানো হবে এবং সেখানে কত কর দিতে হবে। মার্কিন কর আইনের ধারা ৪৮২ অনুসারে, সম্পর্কিত ব্যবসার মধ্যে লেনদেন যদি ন্যায্যমূল্য অনুযায়ী না হয়, তাহলে আইআরএস করযোগ্য আয় সমন্বয় করতে পারে। কিন্তু নিয়মটি প্রয়োগ করা অত্যন্ত জটিল, কারণ একই ধরনের লেনদেন কোনো তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে তুলনা করার সুযোগ প্রায়ই থাকে না। ফলে দুই পক্ষ একই তথ্য বিশ্লেষণ করেও ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে, যা বছরের পর বছর ধরে চলা বিরোধের জন্ম দেয়। ইউনাইটেডহেলথের ক্ষেত্রে অবশ্য কোন ধরনের লেনদেন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি। অনেক বড় বিরোধই বৌদ্ধিক সম্পত্তি বিদেশি সহযোগী প্রতিষ্ঠানে হস্তান্তরের সঙ্গে জড়িত বলে অধ্যাপক আভি-ইওনাহ উল্লেখ করেন; তবে ইউনাইটেডহেলথ সম্পর্কে নির্দিষ্ট কিছু বলতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।

অন্যান্য বড় কোম্পানির অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, এ ধরনের লড়াই কত বড় হতে পারে। কোকা-কোলার বিবাদে কর ও সুদের পরিমাণ প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ২০০৭-২০০৯ সালের জন্য কোম্পানিটি ইতিমধ্যে আইআরএসকে ৬ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে, যদিও আপিল প্রক্রিয়া চলমান। ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের জন্য আরও প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত কর ও সুদ দিতে হতে পারে, যদি কর আদালতের রায় চূড়ান্তভাবে টিকে যায়। চলতি বছরের ৩ জুলাই পর্যন্ত কোম্পানিটির রিজার্ভ ছিল ৫২৯ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে মেটা ২০১৭-২০১৯ সালের জন্য আইআরএসের ১৫.৮৯ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত কর, সুদ ও জরিমানার দাবির বিরুদ্ধে লড়ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কোম্পানিটি কর আদালতে আবেদন করেছে। মেডট্রনিকের লড়াই শুরু হয়েছিল ২০০৫ ও ২০০৬ সালের কর বছর নিয়ে; মার্চ মাসে এটি নিষ্পত্তির আলোচনায় প্রবেশ করেছে, যদিও এর আগে দুবার ফেডারেল আপিল আদালতে যেতে হয়েছে। অধ্যাপক আভি-ইওনাহ লিখেছেন, এই মামলাটি সমাধান হতে বিশ বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে। কোনো একটি মামলার ফলাফল ইউনাইটেডহেলথের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, কিন্তু এগুলো দেখায় যে ট্রান্সফার প্রাইসিংয়ের লড়াই একবার তীব্র হলে তা কত বিশাল ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

যদি পরীক্ষা পর্যায়ে এই বিবাদের মীমাংসা না হয়, তাহলে ইউনাইটেডহেলথ আইআরএসের প্রশাসনিক আপিল প্রক্রিয়ায় যেতে পারে এবং পরবর্তীতে আদালতে মামলা দায়েরের সুযোগও থাকবে। কোম্পানির ফাইলিংয়ে আরও একটি সংখ্যা উল্লেখ আছে—২০২৫ সালের শেষে তাদের মোট অনিশ্চিত কর অবস্থানের জন্য রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.৬ বিলিয়ন ডলার, যা এক বছর আগে ছিল ৪.১ বিলিয়ন ডলার। তবে কোম্পানি স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই অঙ্ককে বর্তমান নোটিশের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ঠিক হবে না। মুখপাত্র জানান, এই ৫.৬ বিলিয়ন ডলার সব অনিশ্চিত কর অবস্থানের জন্য সংরক্ষিত এবং “এটিকে নোপার সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থ হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।” এই বিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থের পরিমাণ কত বা কোন সহযোগী প্রতিষ্ঠান জড়িত—এসব বিষয়ে কোম্পানি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

ফেডারেল আইনে ব্যক্তিগত করদাতাদের তথ্য প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় আইআরএসও ফরচুনের অনুরোধে কোনো মন্তব্য করেনি। ইউনাইটেডহেলথ আগস্টের নথিতে জানিয়েছে, বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে তাদের অনিশ্চিত কর অবস্থানের জন্য রিজার্ভ পর্যাপ্ত এবং প্রস্তাবিত সমন্বয়ের বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ অব্যাহত রাখবে। মূল প্রতিবেদনটি ফরচুন ডটকমে প্রকাশিত হয়েছিল।