দেশের চলচ্চিত্র খাতকে কেবল বিনোদন বা সংস্কৃতির মাধ্যম হিসেবে না দেখে একটি শক্তিশালী উৎপাদনমুখী শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, উপযুক্ত নীতিমালা প্রণয়ন করা গেলে এই খাতে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। শনিবার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি: স্লোগান নাকি সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে এই তথ্য তুলে ধরা হয়।

ওয়েবিনারটির সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী, দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেদওয়ান রনি, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও ক্রিয়েটিভ উদ্যোক্তা তানিম নূর, নাট্যকার ও অভিনেতা বাকার বকুল এবং হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রোডাক্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদ বিন আবদুস সালাম।

ওয়েবিনারে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার পরিচালক তানিম নূর জানান, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্রকে শুধু ‘সংস্কৃতি চর্চা’ হিসেবে দেখা হয়েছে, অর্থনীতির বাইরে রাখা হয়েছে। সত্তর ও আশির দশকের সুবর্ণ সময়ে এই খাতে প্রায় দুই লাখ মানুষ যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সিনেমা হল, পোস্ট-প্রোডাকশন ও ভিএফএক্সের মতো নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ায় কর্মসংস্থানের পরিমাণ ১০ লাখে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর মতে, এতে এই খাতের বাজার আকার ৫ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে এবং সরকার বার্ষিক ৫০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে সক্ষম হবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সঠিক সরকারি নীতি ও পৃষ্ঠপোষকতা।

দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ টেনে তানিম নূর বলেন, ১৯৯৩ সালে স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘জুরাসিক পার্ক’ সিনেমাটি দক্ষিণ কোরিয়ায় মুক্তি পেলে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গণনা করে দেখেন যে এই একটি সিনেমার আয় প্রায় ১৫ লাখ হুন্দাই সেডান গাড়ি বিক্রির সমান। এরপরই কোরিয়া সরকার চলচ্চিত্রকে সেবা খাতের পরিবর্তে উৎপাদনমুখী শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যার সুফল আজ বিশ্বজুড়ে কোরিয়ান চলচ্চিত্রের সাফল্যে প্রতিফলিত হচ্ছে।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেন, সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে প্রথাগত ও একমাত্রিক অবকাঠামোগত ধারণা নিয়ে এগোলে চলবে না। শিল্পকে ‘বিশুদ্ধতার’ সংকীর্ণ ধারণায় আটকে রাখাও কার্যকর হবে না। দেশে এই খাতের জন্য পর্যাপ্ত দর্শক ও ভোক্তা রয়েছেন, যাঁরা অর্থ ব্যয় করতেও রাজি। সরকার যদি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সঠিক অবকাঠামো তৈরি করে, তবে এই খাতকে টেকসই করা সম্ভব। তিনি শিল্পকলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর আমলাতান্ত্রিক পরিচালনার সমালোচনা করে বলেন, এগুলো কেবল স্মরণসভা বা অনুরূপ কাজেই ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখান থেকে কোনো রাজস্ব আসছে না।

‘চরকি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেদওয়ান রনি দেশীয় ওটিটি শিল্পের কর ব্যবস্থার অসংগতি ও বিদেশি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, এক কোটি টাকার একটি ওটিটি কনটেন্ট তৈরি করতে ২৭ লাখ টাকা কর হিসেবে দিতে হয়। অথচ এই খাতের জন্য আলাদা কোনো নিবন্ধনব্যবস্থা বা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় নেটফ্লিক্সের মতো বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলো কর ফাঁকি দিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক পেমেন্ট জটিলতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। বর্তমানে বিশ্বের ১৮০টির বেশি দেশ থেকে দর্শক ‘চরকি’ দেখছেন এবং ৩৬টির বেশি আন্তর্জাতিক মুদ্রায় পেমেন্ট আসছে। কিন্তু পেপাল বা স্ট্রাইপের মতো মাধ্যম বাংলাদেশে সচল না থাকায় আন্তর্জাতিক ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের পেমেন্ট সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকে আসতে পারে না, ফলে বাধ্য হয়ে অন্য দেশের অংশীদারের মাধ্যমে পেমেন্ট নিতে হয় এবং আয়ের একটি বড় অংশ দেশের বাইরে চলে যায়।

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল খাতের টেকসই বিকাশের জন্য কাঠামোগত সংস্কার এবং একটি কেন্দ্রীয় কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। পাশাপাশি তিনি শিল্পীদের মেধাস্বত্ব ও রয়্যালটি নিশ্চিত করতে আইনি প্রয়োগের দাবি জানান। ইউপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, বর্তমানে প্রিন্ট পাইরেসির পাশাপাশি ডিজিটাল পাইরেসি বা অনলাইনে বইয়ের অবৈধ কপি ছড়ানোর প্রবণতা মহামারি আকার ধারণ করেছে, যা প্রকাশকদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।

নাট্যকার ও অভিনেতা বাকার বকুল অভিযোগ করেন, সরকারের দায়িত্ব ছিল শিল্পকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া, কিন্তু তারা এটিকে সব সময় ‘প্রোপাগান্ডা মেশিন’ হিসেবে ব্যবহার করেছে। প্রতিটি সরকারই কালচারাল অ্যাকটিভিজমের নামে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রোডাক্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদ বিন আবদুস সালাম বলেন, হস্তশিল্পের বড় সুবিধা হলো কর্মসংস্থানের জন্য মানুষের ঢাকা আসার প্রয়োজন হয় না; কাঁচামাল যেখানে সহজলভ্য, সেখানেই ঘরে বসে আয় করা সম্ভব।