আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে জাতীয় শিক্ষাক্রমে যুক্ত হতে যাচ্ছে চারটি নতুন পাঠ্যপুস্তক। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সূত্র জানাচ্ছে, ২০২৭ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যক্রমে সীমিত পরিসরে কিছু পরিমার্জন আনা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি করে মোট চারটি বই সংযোজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৮ সাল থেকে শিক্ষাক্রম আরও বিস্তৃতভাবে পরিমার্জনের মাধ্যমে বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় শিক্ষার্থীদের শেখার ধরনে নতুন মাত্রা যোগ হওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের সাম্প্রতিক ১৮০ দিনের কার্যক্রম সম্পর্কিত ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক প্রকাশনায় উল্লেখ রয়েছে, চলতি বছরের ডিসেম্বরে—চূড়ান্ত পরীক্ষার সময়কালেই—শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বছরের শুরু থেকেই নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই বিনামূল্যের বই বিতরণ শুরু হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছাপা ও সরবরাহে নানা জটিলতায় বিলম্ব ঘটেছে। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে সব বই সরবরাহে প্রায় তিন মাস সময় লেগেছিল, আর চলতি শিক্ষাবর্ষে শতভাগ বই পৌঁছাতে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই বিলম্বের কারণে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং শিক্ষার্থীরা বছরের শুরুতেই পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়েন।

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের জানিয়েছেন, প্রাক্-প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই ছাপার কাজ অল্প দিনের মধ্যেই শুরু হবে। অন্যান্য শ্রেণির বইয়ের মুদ্রণও ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে আরম্ভ হওয়ার আশা করা হচ্ছে। সংস্থাটির লক্ষ্য হলো ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব বই ছাপিয়ে মাঠপর্যায়ে পাঠানো, যাতে ডিসেম্বরের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হাতে তা তুলে দেওয়া যায়। তবে পাঠ্যবই পরিমার্জনের কারণে ইতিমধ্যে বেশ কিছু সময় ব্যয় হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তাদের মতে, আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার দরপত্র, পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত, মুদ্রণ ও সরবরাহ—সব ধাপ আগেভাগে শেষ করার চেষ্টা চলছে।

সূত্রমতে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বইয়ের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সময়মতো ছাপা শেষ করা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। প্রতিবছর বিনা মূল্যের বই ছাপা ও বিতরণের ক্ষেত্রে কাগজের সরবরাহ, দরপত্র-সংক্রান্ত জটিলতা, মুদ্রণ ও সংশোধনের কাজ, ছাপাখানার সক্ষমতা এবং বই পরিবহনের মতো বিষয়গুলো সময়সূচিতে প্রভাব ফেলে। ফলে শুধু ছাপার কাজ সম্পন্ন করাই যথেষ্ট নয়; নির্ধারিত সময়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কাছেও বই পৌঁছানো নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

নতুন যুক্ত হতে যাওয়া বইগুলোর মধ্যে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’। ‘খেলাধুলা’ বইয়ে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কাবাডিসহ আটটি খেলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের বিষয়টি এতে বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। অন্যদিকে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইয়ে শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ধারণা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে; যেমন ‘আমি ও আমার সংস্কৃতি’ অধ্যায়ে ব্যক্তিজীবনে সংস্কৃতির প্রভাব ও নিজের পরিচয় নিয়ে আলোচনা থাকবে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হবে ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ এবং ‘আনন্দময় শিখন’। প্রথমটির মাধ্যমে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তোলার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় বইটিতে শেখার সঙ্গে আনন্দ ও সৃজনশীলতার সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা আনন্দের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত হন।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষাবর্ষের শুরুতে বই না পেলে শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়েন। তাই ডিসেম্বরেই বই পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বছরের শুরু থেকেই নির্বিঘ্ন পাঠদানের সুযোগ তৈরি হবে। তবে সময়সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি বইয়ের গুণগত মান, নির্ভুলতা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে সময়মতো বিতরণ নিশ্চিত করার দিকেও সমান নজর দিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।