‘মোজি অ্যান্ড কোং’ নামের একটি ডুয়ো ব্যান্ড এখন সামাজিক মাধ্যমের আলোচিত নাম। ব্যান্ডটির দুই প্রাণভোমরা হলেন সংগীত পরিচালক-গায়ক শুভেন্দু দাশ শুভ ও শিল্পী সানজিদা মাহমুদ নন্দিতা। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত ইয়ামাহা ফ্ল্যাগশিপ সেন্টারে আজ সন্ধ্যায় ‘মেলোডি মোজাইক উইথ মোজি অ্যান্ড কোং’ শীর্ষক এক আয়োজনে তাদের সরাসরি গান শোনার সুযোগ পাবেন দর্শক-শ্রোতারা। পুরোনো দিনের বাংলা ও হিন্দি সুরগুলোকে আধুনিক সাউন্ড ডিজাইনের মোড়কে নতুন প্রজন্মের কাছ এ পৌঁছে দেওয়ার অভিপ্রায় নিয়েই তাদের এই পথ চলা।
কোক স্টুডিও বাংলার মঞ্চে এই জুটি আগেই সুনাম কুড়িয়েছেন ‘বুলবুলি’ ও ‘দাঁড়ালে দুয়ারে’-র মতো প্রশংসিত গান গেয়ে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজস্ব কোনো ব্যান্ড গড়ে তোলার ভাবনাটা তাদের মাথায় ছিল না। ২০২৪-এর শেষের দিকে পরিকল্পনাবিহীনভাবে নন্দিতার ফেইসবুক পেজে পুরনো দিনের চর্চিত গান ‘ইয়ে রাতে ইয়ে মৌসাম’-এর একটি কাভার সংস্করণ আপলোড করা হয়। প্রকাশিত হওয়ার পর গানোটির প্রতি শ্রোতাদের ব্যাপক সাড়াই তাদের ভাবতে বাধ্য করল ভিন্ন কথা।
সেই ভাবনার বাস্তব রূপ নেয় 2025 সালের জানুয়ারিতে। 3 জানুয়ারি ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পৃষ্ঠার মাধ্যম আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘মোজি অ্যান্ড কোং’-এর। এই নামকরণের পেছনে একটি দর্শনও রয়েছে। ‘মোজি’ শব্দটি দিয়ে তাঁরা বোঝাতে চান হুড়োহুড়ি নয়, বরং স্বস্তি ও স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করার এক অভিনব মনোভাব। শুভেন্দু ভাষায়, এটি তাদের জন্য এক ধরনের নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা, যেখানে বাণিজ্যিক ব্যস্ততা সরিয়ে রেখে শুধুমাত্র নিজেদের পছন্দের গান তৈরি করেন। নন্দিতা যোগ করেন, নিজেদের মুড ও পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে তারা এই কাজ করেন বলে এটি কখনোই একঘেয়ে লাগে না।
তাদের গানোর মূল অনুনাস্য প্রেরণা হল শৈশব। মায়ের কণ্ঠে শোনা আধুনিক গান ও ক্যাসেট প্লেয়ারের সোনালি দিনের গানগুলোই তাদের শৈল্পিক চর্চার ভিত্তি। সেই সব হারিয়ে যেতে বসা সুরকে তারা নতুন সাউন্ড ডিজাইনে ফুটিয়ে তুলছেন।
এই পথ চলায় সবচেয়ে নাটকীয় প্রাপ্তিটি আসে এ আর রাহমানের কাছ থেকে। গত এপ্রিলের এক বৃষ্টির দিনে আড্ডার ছলে স্টুডিওর মধ্যে নন্দিতা ‘স্বদেশ’ চলচ্চিত্রের ‘সাওয়ারিয়া’ গানটির সুর গাইছিলেন। শুভেন্দু তাৎক্ষণিক একটি খাটো ভিডিও বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমের জন্য শেয়ার দেন। 17 জুলাই সকালে ঘুম ভাঙার পর তারা দেখতে পান ভক্তদের অভিনন্দনের বন্যা। কারণ, স্বয়ং অস্কারজয়ী সুরকার এ আর রাহমান তাঁর নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরির মাধ্যমে তাদের এই কভার সংস্করণটি পুনঃপ্রচার করেছিলেন। এ ঘটনা বিশ্বাস করতে না পেরে নন্দিতা রাহমানের অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল বারবার ঘুরে দেখেছেন। এই স্বীকৃতিকে তারা ভবিষ্যতের জন্য বিশাল এক অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখছেন।
বড় পরিসর ও দর্শকীয় আয়োজন সঙগীতের চলমান প্রবণতার উল্টো দিকে হাঁটছে মোজি অ্যান্ড কোং। মাত্র একটি গিটার ও দুটি কণ্ঠ—এই অনাড়ম্বর আয়োজনেই তাদের স্বকীয় ধারার সৃষ্টি। শুভেন্দুর ধারণা, অতিরিক্ত কোলাহল এড়িয়ে মানুষ এখন নির্মল, ব্যক্তিগত অনুভূতির সুর খোঁজে। তাদের সৃষ্ট এই শান্ত ধারার গান ব্যস্ত নগরজীবনে মানসিক প্রশান্তি যোগায়। একজন অভিভাবক জানিয়েছেন, তার সন্তান পড়ার সময় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে তাদের গান শুনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। নন্দিতা আরও মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতার কথা বলেন—80 বছরের বেশি বয়সি এক মা, যিনি ডিমেনশিয়ায় ভুগছেন, তাদের গান শোনালে তিনিই শুধু হাসেন। আবার তীব্র দুশ্চিন্তাগ্রস্ত একজন নারী তাদের জানান, কোনো কিছুই তাকে শান্ত করতে না পারলে তিনি এই ব্যান্ডের গান শুনেন। শুভেন্দু ও নন্দিতার কাছে এই প্রতিক্রিয়াগুলোই সবচেয়ে বড় পাওয়া।
তাদের ডিজিটাল শ্রোতাদের বেশিরভাগই তরুণ, যাদের বয়স 25 থেকে 30 বছরের মধ্যে। 30 থেকে 45 বছর বয়সীদের অংশগ্রহণও চোখে পড়ার মতো। একটি সরাসরি অনুষ্ঠানে ওয়াকার নিয়ে আসা 80 বছর বয়সি এক নারীর উপস্থিতি নন্দিতাকে আবেগতাড়িত করে ফেলে এবং গানরত অবস্থায় কাঁদতে বাধ্য করে। কভার গানের সফরতার পাশাপাশি এখন তারা মৌলিক গান রচনায় মনোনিবেশ করেছেন। চলতি বছরের শেষ প্রান্তে একটি অ্যালবাম অথবা একাধিক সিঙ্গল প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। তবে মৌলিক গানে নানা বৈচিত্র্য এলেও তাদের নিজস্ব ‘সফট সাউন্ড’-এর ধরন অক্ষুণ্ণ রাখতে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ।




