রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের বুকে এখন আর ভাসে না সেই গোলাপি শাবকটি। প্রায় দশ মাস আগে তার মৃত্যু হলেও মায়ের সেই প্রাণান্তকর চেষ্টার দৃশ্য এখনো ভোলেনি এলাকাবাসী। পানিতে নিথর পড়ে থাকা ছোট্ট শাবকটিকে ছেড়ে যেতে চায়নি মা হাতি। বারবার শুঁড় দিয়ে ঠেলে, পা দিয়ে টেনে তোলার চেষ্টা করেছে সে। এক জায়গায় ব্যর্থ হয়ে অন্য পাড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করেছে। কিন্তু ছোট্ট শরীরটি আর সাড়া দেয়নি। মায়ের অস্থিরতা, কান ঝাঁকানো, মাথা নাড়ানো, গাছের ডাল ভাঙা—সবই ছিল নিষ্ফল।

গোলাপি নামটি রাখা হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্য প্রাণী গবেষক এম এ আজিজের হাত ধরে। ২০২৫ সালের ১৫ জুন রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় একদল বন্য হাতিকে সাঁতরে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যেতে দেখা যায়। সেই দলের একটি শাবকের গায়ে হালকা গোলাপি আভা ছিল। ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বন বিভাগের সহযোগিতায় বরকলের পাহাড়ি এলাকায় হাতির দলটিকে খুঁজে পাওয়া যায়। দলে ছিল আটটি হাতি—পাঁচটি পূর্ণবয়স্ক, একটি কিশোর ও দুটি শাবক। সবচেয়ে ছোট শাবকটিই ছিল গোলাপি।

সাধারণত হাতির শাবকের শরীরে কালো লোম থাকে, কিন্তু গোলাপির শরীরে ছিল বাদামি লোম আর হালকা গোলাপি আভা। চোখও ছিল হালকা গোলাপি। অধ্যাপক এম এ আজিজ জানান, গোলাপি মায়ের কাছ থেকে দূরে যেত না। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই মায়ের পায়ের মাঝে ঢুকে যেত। দলের আরেকটি শাবকের সঙ্গে তার খুনসুটিও চলত। এত ছোট বয়সেই কাপ্তাই হ্রদ পাড়ি দিতে পারত সে।

গোলাপি কোনো আলাদা প্রজাতির ছিল না, ছিল এশীয় হাতিরই একটি শাবক। শরীরের রঙের কারণেই তাকে আলাদা দেখাত। অধ্যাপক আজিজ তাঁর ‘বিপন্ন হাতির কথা’ বইয়ে লিখেছেন, এ ধরনের হাতিকে অ্যালবিনো হাতি বলা হয়। প্রায় ১০ হাজার শাবকের মধ্যে একটি এমন রং নিয়ে জন্মাতে পারে। বুনো পরিবেশে এমন হাতি বিরল।

কিন্তু এই বিরল রংই গোলাপির জন্য তৈরি করেছিল বাড়তি ঝুঁকি। অ্যালবিনো প্রাণীদের শরীরে মেলানিনের ঘাটতির কারণে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে সুরক্ষা কমে যায়। ত্বক পুড়ে যাওয়া, চোখের সমস্যাসহ নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। শুধু তাই নয়, বাসস্থানের সংকটও ছিল প্রকট। গোলাপিদের দলটি থাকত কাপ্তাই হ্রদের ছোট-বড় টিলায়, যেগুলোর অনেকগুলোই ব্যক্তিমালিকানাধীন। সেখানে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক বন না থাকায় খাবারের জন্য তাদের মানুষের বাগান ও ফসলের জমির ওপর নির্ভর করতে হতো। ফলে মানুষ ও হাতির সংঘাতও ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।

ষাটের দশকে কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দেওয়ার পর বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়, বদলে যায় হাতির বিচরণভূমি। পরে পাহাড়ি এলাকায় মানুষের বসতি, বাগান ও চাষাবাদ বেড়ে যায়। বর্ষায় হ্রদের পানি বাড়লে হাতিদের চলাচলের জায়গা আরও কমে যায়। খাবারের সন্ধানে এক টিলা থেকে আরেক টিলায় যেতে হতো তাদের, মাঝখানে থাকত পানি। ছোট্ট গোলাপিকেও তাই অল্প বয়সেই সাঁতার শিখতে হয়েছিল।

মানুষের ফসলের কাছে গেলে হাতিদের তাড়াতে স্থানীয়রা গাছের ডাল, মাটির ঢেলা, কাঠের টুকরা এমনকি আগুনও ব্যবহার করত। অধ্যাপক আজিজ দেখেছেন, নৌকা থেকে হাতিদের দিকে পানিভর্তি প্লাস্টিকের বোতলও ছোড়া হতো। তখন ছোট গোলাপি ও অন্য শাবকটি মা হাতিদের পেটের নিচে আশ্রয় নিত।

২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর রাতে কাপ্তাই হ্রদের পানিতে হাতির একটি শাবকের নিথর দেহ ভাসতে দেখেন স্থানীয়রা। পরে নিশ্চিত হওয়া যায়, সেটিই গোলাপি। রাঙামাটির বন সংরক্ষক মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল সরকার জানান, উঁচু পাহাড় থেকে পড়ে গোলাপির মৃত্যু হয়েছিল। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল প্রায় ৯ মাস।

গোলাপির মৃত্যুর পর মা হাতির শোকের দৃশ্য দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন অনেকেই। মা হাতি শাবককে ছেড়ে যেতে চায়নি, বারবার তার দেহ তুলে আনার চেষ্টা করেছে। অধ্যাপক এম এ আজিজ জানান, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এমন রঙের আর কোনো বন্য হাতি দেখা যায়নি। এশিয়ায় বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় এমন একটি হাতি বেঁচে রয়েছে। অল্প সময়ের জন্য দেখা মিললেও রাঙামাটির পাহাড়ের বুকে গোলাপি চিরকালের জন্য এক বিরল স্মৃতি হয়ে রইল।