কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্তব্যরত নারী চিকিৎসকদের সম্বোধনের বিষয়ে একটি বিতর্কিত নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসকের কক্ষের দরজায় হাতে লেখা ওই নির্দেশনায় বলা হয়, রোগী ও তাদের স্বজনরা যেন কোনো নারী চিকিৎসককে ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ ছাড়া অন্য কিছু না ডাকেন। খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয় এবং শুক্রবার বিকেলে বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরে এলে ওই নির্দেশনাটি সরিয়ে ফেলা হয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে থাকা আবুল কালাম আজাদ জানান, সরকারি চাকরির বিধিমালায় চিকিৎসকদের ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি নিজে স্টাফদের দিয়ে ওই নির্দেশনাটি ছিঁড়ে ফেলেছেন এবং এটিকে ‘অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার ভাষ্য, চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় গুণ হলো মানবিক হওয়া এবং রোগীদের সেবা করাই তার প্রধান দায়িত্ব। ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলতেই হবে— এমন নির্দেশনা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক মাস আগে জরুরি বিভাগের দরজায় এই হাতে লেখা নির্দেশনা টানানো হয়েছিল। যদিও বিষয়টি নিয়ে হাসপাতালের ভেতরে আলোচনা-সমালোচনা ছিল, তবে ছবি ছড়িয়ে পড়ার পরই তা প্রকাশ্যে আসে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা বেশিরভাগ মানুষই গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা। তাদের অনেকেই হতদরিদ্র, কেউ কম শিক্ষিত এবং কেউ সহজ-সরল প্রকৃতির। প্রচলিত আঞ্চলিক ভাষা ও সামাজিক রীতি অনুযায়ী তারা দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকদের ‘ভাই’ বা ‘আপা’ বলে সম্বোধন করে আসছেন, যা দিয়ে তারা চিকিৎসকদের অসম্মান করতে চান না বলে জানান। তাদের মতে, চিকিৎসা নিতে এসে সম্বোধনের ধরন নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়া রোগীদের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর।

নবীপুর এলাকার বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন, তারা গ্রামের মানুষ, মহিলাদের ‘আপা’ আর পুরুষদের ‘ভাই’ বলে ডাকেন। এই হাসপাতালের ডাক্তারদের ‘ভাই’ বা ‘আপা’ বললে তারা রেগে যান এবং সেবা দেওয়ার বদলে রাগারাগি করেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মচারী জানান, কয়েক মাস আগে নতুন কয়েকজন নারী চিকিৎসক যোগ দেওয়ার পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি নিজেও একবার এক নারী চিকিৎসককে ‘আপা’ বলে সম্বোধন করায় তিনি রাগান্বিত হন এবং পরে ‘ম্যাডাম’ বা ‘স্যার’ বলে ডাকতে বলেন।

এদিকে, হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এমন নির্দেশনার কারণে পুরো হাসপাতালের চিকিৎসকদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। তাদের মতে, চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার পাশাপাশি রোগীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোন নারী চিকিৎসকের কারণে ওই নির্দেশনা লাগানো হয়েছে তা এখনো নিশ্চিত নন বলে জানান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, হাসপাতালে নবীন কয়েকজন নারী ডাক্তার রয়েছেন, তাদের মধ্যে কারও কারণে এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে শুনেছেন, তবে নির্দিষ্ট কে তা খতিয়ে দেখছেন।

কুমিল্লার সিভিল সার্জন আলী নূর মোহাম্মদ বশীর আহমেদ বিষয়টির বিস্তারিত খোঁজ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, তিনি মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্যই চাকরি করেন এবং কেউ তাকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করলেও তিনি কিছু মনে করবেন না। চিকিৎসকদের ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলে ডাকার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।