চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় কর্ণফুলী নদী এখন স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলামের ঘর থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে। সরফভাটার গোডাউন ব্রিজের পাশে ছোট চায়ের দোকান চালানো এই মানুষটির ভয় এখন বৃষ্টি এলেই বেড়ে যায়। রাতে ঘুম ভেঙে যায় এই ভয়ে যে, হয়তো কোনো এক সময় ঘরসহ তিনি নদীতে তলিয়ে যাবেন। পাশেই রেজাউল করিমের বাড়ি, তার উদ্বেগ শুধু বসতভিটা নয়, গোডাউন ব্রিজের নিরাপত্তা নিয়েও। তিনি জানান, সেতুর খুঁটির নিচ থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হয়েছে, ফলে খুঁটির চারপাশে গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে।
রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী, সরফভাটা, চন্দ্রঘোনা, কদমতলী, ইসলামপুর, দক্ষিণ রাজানগরসহ আশপাশের এলাকায় অবৈধ বালু ব্যবসার একটি বড় চক্রের তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি প্রশাসনের একটি অংশের যোগসাজশে এই চক্রটি নদীকে কেন্দ্র করে বালু-বাণিজ্য চালাচ্ছে। শুধু রাঙ্গুনিয়াই নয়, মিরসরাই ও সাতকানিয়াতেও ইজারার সীমানা না মেনে বালু তোলার অভিযোগ রয়েছে। জেলা প্রশাসনের এক সূত্র জানায়, মিরসরাইয়ে প্রায় ১০০টি যন্ত্র দিয়ে অবৈধভাবে বালু তোলা হয়; প্রশাসন এক পাড়ে পৌঁছানোর আগেই যন্ত্রপাতি অন্য পাড়ে সরিয়ে নেওয়া হয়।
বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে এই এলাকায় অন্তত ৭টি খুনসহ ২০টির বেশি খুন-জখম ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১২টির সঙ্গে বালুসংক্রান্ত বিরোধের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। সর্বশেষ গত ১৩ জুন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরী প্রকাশ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয়দের ভাষ্য, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে বালুর ব্যবসা ও দলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম জানান, বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করলে হুমকি দেওয়া হতো। বিদেশ থেকে ফেরার ১৫ দিনের মধ্যে হুমায়ুন নামের এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। এ কারণে নদীপাড়ের অধিকাংশ মানুষ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে রাঙ্গুনিয়ার তৎকালীন সংসদ সদস্য ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের অনুসারীরা অবৈধ বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন, মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল তার ভাই এরশাদ মাহমুদের হাতে। কোন এলাকায় কারা বালু তুলবেন তা তিনিই ঠিক করে দিতেন। জেলা প্রশাসনের এক সূত্র জানায়, এখন প্রতি ঘনফুট বালুর ইজারামূল্য গড়ে সাড়ে চার টাকার বেশি, অথচ আওয়ামী লীগের সময় ৩০ পয়সাতেও ইজারা দেওয়া হতো। ৫ আগস্টের পর হাছান মাহমুদদের নিয়ন্ত্রণ ভাঙলেও বালু-বাণিজ্য বন্ধ হয়নি; বরং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিএনপির একাধিক পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ বেড়েছে।
রাঙ্গুনিয়ার বালুমহাল থেকে প্রতি মাসে ৭২ লাখ টাকা চাঁদা পেতেন চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী। তার সহযোগী আবদুল কাইয়ুম ওরফে ইমনকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে এই অর্থপ্রবাহের তথ্য পাওয়া যায়। পুলিশ সূত্র জানায়, পোমরা এলাকায় প্রতি বাল্কহেড থেকে গড়ে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হতো। চাঁদা না পেলে বাল্কহেড জিম্মি করা, চালককে মারধর এবং একটি বাল্কহেড ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়। চাঁদার টাকা চান্দগাঁওয়ের ইমনের মাধ্যমে ভারতে অবস্থানরত সাজ্জাদের কাছে যেত।
কর্ণফুলীর উত্তর পাড়ে রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ও দক্ষিণ পাড়ে বোয়ালখালী— এই ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে একটি আন্ত-উপজেলা বালু সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। বোয়ালখালীর কয়েকটি চক্রের সঙ্গে রাঙ্গুনিয়ার কিছু রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও পরিবহন ব্যবসায়ী যুক্ত। এক পাড়ে প্রশাসনিক অভিযান শুরু হলে ড্রেজার অন্য পাড়ে সরিয়ে সীমানা জটিলতা তৈরি করা হতো। মির্জাখিলের বাসিন্দা মোহাম্মদ জাহেদ বলেন, কোনো কোনো রাতে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৮টি পর্যন্ত ড্রেজার দেখা যেত।
বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তীর ভেঙে বহু ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। নদীপাড় জামে মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ হোসাইন জানান, সাত বছর আগে মসজিদ থেকে নদীর দূরত্ব ছিল ৩০-৩৫ ফুট, এখন তা এত কাছে এসেছে যে যেকোনো সময় মসজিদটি নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের রাঙ্গুনিয়া-রাঙামাটি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা বলেন, রাতে চুরি করে পাড় ঘেঁষে বালু তোলায় গোডাউন, সরফভাটাসহ কয়েকটি স্থানে তীর ভাঙছে; জরিপ শেষে ভাঙনরোধে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হবে।
বেতাগীর প্রজেক্ট গেট এলাকায় বালুর বিশাল স্তূপ দেখা যায়। স্থানীয়রা জানান, পরিত্যক্ত জায়গাটি বালু মজুতের কাজে ব্যবহৃত হয়। এক কৃষক জানান, তার প্রায় ২০ শতক জমি এখনো বালুর নিচে পড়ে আছে। স্থানীয় বাসিন্দা ইদ্রিস আলম বলেন, বালুর স্তূপ এত উঁচু ছিল যে বিদ্যুতের তার ছুঁয়ে যেত; ছয় বছরের এক শিশু সেই স্তূপে খেলতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়। বালু মজুতের স্থান ও নদীর ঘাট পাহারা দিতে অস্ত্রধারী লোক রাখা হতো, কেউ ছবি বা ভিডিও করছে কি না তা নজরদারি করা হতো।
গত জাতীয় নির্বাচনের আগে সবাই কর্ণফুলী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তা আটকানো যায়নি। চট্টগ্রাম-৭ আসনের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, নির্বাচনের আগে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করবেন এবং সেটি করেছেন। তিনি আরও বলেন, বালুর কারণে রাঙ্গুনিয়ায় নানা ঘটনা ঘটছে; বালু তোলা বন্ধ থাকায় সব শান্ত। সংসদে তিনি জানান, ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত রাঙ্গুনিয়ার বালুমহাল থেকে ১২ কোটি ৮০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে, অথচ নদীভাঙন ঠেকাতে প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্য�় হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, চলতি বছরে রাঙ্গুনিয়ার সব বালুমহালের ইজারা বন্ধ করা হয়েছে। তবে রাতের অন্ধকারে অবৈধভাবে বালু তোলা পুরোপুরি ঠেকানো কঠিন; সীমিত জনবল দিয়ে সব জায়গায় একসঙ্গে নজরদারি সম্ভব নয়। তিনি প্রশাসনের কারও সঙ্গে যোগসাজশের সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ না পাওয়ার কথাও জানান।
চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, এত বড় পরিসরে বালু উত্তোলন সরকারি সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অজান্তে চলতে পারে না। বছরের পর বছর এসব চললেও কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়াই প্রমাণ করে, রাজনৈতিক প্রভাবশালী, বালু ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের ব্যক্তিদের যোগসাজশ রয়েছে। তার মতে, জবাবদিহি নিশ্চিত না করে শুধু অভিযান চালিয়ে কর্ণফুলী ও পাড়ের মানুষের আবাসস্থল রক্ষা সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বালু দখলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক বেলায়েত হোসেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সময়ের সুবিধাভোগীরা বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে এসব অপকর্ম করছেন এবং দল তাদের বিষয়ে সতর্ক রয়েছে। তবে অভিযুক্ত সালাহউদ্দিন দাবি করেন, সরকারিভাবে অনুমতি পাওয়া বালুই তিনি বিক্রি করেছেন; বরং ব্যবসা করতে গিয়ে বিভিন্ন লোকজনকে চাঁদা দিতে হয়েছে। মো. জাহাঙ্গীরও দাবি করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদী খননের দরপত্র অনুযায়ী বেতাগীতে বালু তোলা হয়েছে। ইউসুফ সিকদার, এস এম লোকমান ও মো. ইব্রাহিমও অবৈধ বালু ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।




