আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা এবং রাশিয়ার কঠোর অবস্থানের ফলে এক কঠিন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে জাপান। টোকিও বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে তাকে একদিকে আইনের শাসন ও আদালতের স্বাধীনতার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে তার প্রধান নিরাপত্তা মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে হচ্ছে।

গত ৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেয়, যা নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সাবেক বিচারক নাভি পিল্লাইয়ের ভূষিত হওয়ার পরপরই সামনে আসে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে আদালতের সম্পদ জব্দ হওয়া, মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে লেনদেনে বাধা এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে পূর্ণ বাস্তবায়নের আগে ১৮০ দিনের একটি ছাড় দেওয়া হয়েছে, যা ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। ওয়াশিংটনের এই আপত্তির মূল কারণ হলো আদালতের এখতিয়ার। রোম সংবিধির সদস্য না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র আশঙ্কা করে যে, আইসিসি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাতে পারে। বিশেষ করে আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযান এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার পর এই বিরোধ তীব্র হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৮ আগস্ট আইসিসির প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানে এবং সেনেগালের আইনজীবী আবদুলায়ে সেয়েককে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।

সংকটের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে রাশিয়া। ইউক্রেন থেকে শিশুদের সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর মস্কো আইসিসির কৌঁসুলি ও বিচারকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করে। ২০২৫ সালে আইসিসির প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানেসহ আট বিচারককে অনুপস্থিতিতে দণ্ড দেয় রাশিয়ার আদালত। বর্তমানে রাশিয়া নেদারল্যান্ডসসহ কয়েকটি দেশের কাছে এসব কর্মকর্তাদের প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার এই দ্বিমুখী চাপে বৈশ্বিক এই আদালত এখন চরম সংকটের মুখে।

জাপানের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ আইসিসির বর্তমান প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানে একজন জাপানি নাগরিক। ২০০৭ সালে রোম সংবিধিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই জাপান আন্তর্জাতিক আইনের শাসন রক্ষায় আইসিসিকে আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পর জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোতেগি তোশিমিৎসু স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, একতরফা এই পদক্ষেপ টোকিওর অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং জাপান আন্তর্জাতিক আদালতের ভূমিকাকে সমর্থন করে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিও সংসদে আইসিসির প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। দেশীয় পর্যায়েও নাগরিক সমাজ ও আইনজীবীদের মধ্যে আদালতের প্রতি গভীর সহানুভূতি রয়েছে।

তবে মিত্রতার হিসাব করে জাপান ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার থেকে বিরত থাকছে। চীন ও উত্তর কোরিয়ার হুমকির মুখে যুক্তরাষ্ট্রই জাপানের প্রধান নিরাপত্তা সহযোগী। তাই জাপানের কৌশল হলো আইসিসির পক্ষে অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখা। প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সেপ্টেম্বরে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে এই বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোতেগি সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ফোনে কথা বলে আইনের শাসন সমুন্নত রাখার কথা জানিয়েছেন।

জাপান এই লড়াইয়ে একা নয়। কানাডা, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি এবং যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোও যৌথ বিবৃতিতে এই নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছে। এছাড়া ১২৫ সদস্যরাষ্ট্রের 'ব্যুরো অব অ্যাসেম্বলি' মার্কিন পদক্ষেপকে জবরদস্তিমূলক বলে অভিহিত করে তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। আইসিসি যেহেতু কর্মী ব্যবস্থাপনা ও তথ্যপ্রযুক্তির জন্য মার্কিন সেবার ওপর নির্ভরশীল, তাই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে তদন্ত ও বিচারিক কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। বর্তমানে সদস্যরাষ্ট্রগুলো বিকল্প ব্যবস্থার সন্ধান করছে। আগামী ১৮০ দিনের সময়সীমাকে জাপান সংলাপের সুযোগ হিসেবে দেখছে যাতে নিরাপত্তা সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হয়।