দেশের ক্রিকেট ইতিহাস সংরক্ষণে নতুন এক সংযোজন ঘটালেন প্রবীণ ক্রিকেট সংগঠক লুৎফুর রহমান মাখন। ৯৩ বছর বয়সে তাঁর লেখা তৃতীয় বই ‘ষাটের দশকের ক্রিকেট এই বাংলায়’ প্রকাশিত হয়েছে। শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের মাওলানা আকরম খাঁ মিলনায়তনে আয়োজিত প্রকাশনা উৎসবে বইটি পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হয়।

ব্রিটিশ আমলে দর্শক হিসেবে ক্রিকেট দেখা, পাকিস্তান আমলে মাঠে নামা—জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই যেন ক্রিকেটকে ঘিরে। সংগঠক হিসেবে ঢাকার মাঠে গ্রীষ্মকালীন কারদার সামার ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন করে তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে সুনাম অর্জন করেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আগে লেখা ‘যখন নির্বাচক ও আমার ক্লাব’ এবং ‘ক্রিকেটের সাথে পথচলা’ বই দুটির পর এবার নতুন বইয়ে ষাটের দশকের ক্রিকেটের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেছেন।

প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান। সভাপতিত্ব করেন সাবেক ক্রিকেটার কাজী হাবিবুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিসিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সাবেক প্রধান নির্বাহী সৈয়দ আশরাফুল হক, সাবেক ক্রিকেটার জাহাঙ্গীর শাহ বাদশা, ওমর খালেদ রুমি, নাজমুল আবেদীন প্রমুখ। সঞ্চালনায় ছিলেন পাক্ষিক ক্রীড়াজগতের সাবেক সম্পাদক দুলাল মাহমুদ।

বইটি নিয়ে বক্তারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, এটি নিছক ইতিহাস নয় বরং ক্রিকেটের এক অনন্য দলিল। সৈয়দ আশরাফুল হক বইটিতে সংযোজিত অসংখ্য স্কোরকার্ডের প্রশংসা করে বলেন, এসব স্কোরকার্ড দেখে ষাটের দশকের ক্রিকেট সম্পর্কে যাদের ধারণা নেই তারাও অনেক কিছু জানতে পারবেন। তিনি নিজেও সে সময়ের অনেক ম্যাচে অংশ নিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন। কাজী হাবিবুর রহমান বলেন, এমন বই লিখে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন মাখন। ওমর খালেদ রুমি বলেন, বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে বই লেখা হয়েছে, তবে এত স্কোরকার্ডসহ এমন বই তিনি আগে দেখেননি।

বিসিবির সাবেক পরিচালক ও কোচ নাজমুল আবেদীন অভিমত ব্যক্ত করেন, এই বয়সেও মাখন ভাই তিনটি বই লেখায় তাঁকে ছাড়া সম্ভব ছিল না। ক্রীড়া লেখক খন্দকার সালেক সুফি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেট ইতিহাসে বইটি অনন্য হয়ে থাকবে। লেখক তাঁর বক্তব্য শুরুতে প্রয়াত কিংবদন্তি ফুটবলার জাকারিয়া পিন্টুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, কখনো ভাবেননি বই লিখবেন; অনেকের অনুরোধ আর সহযোগিতায় তা সম্ভব হয়েছে। আশা করছেন বইটি পাঠকদের ভালো লাগবে।

৫৫২ পৃষ্ঠার বইটির নামে ষাটের দশক থাকলেও তার আগে-পরের ইতিহাসও উঠে এসেছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে কীভাবে ক্রিকেট খেলা হতো, কারা খেলতেন—সেসব বিবরণ স্থান পেয়েছে। পঞ্চাশের দশকে শুরু হওয়া কারদার সামার ক্রিকেট, কায়দে আজম ট্রফি, আইয়ুব ট্রফি, ইপিএসএফ নকআউট টুর্নামেন্ট, আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেটসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। বইটিতে ষাটের দশকের কিছু দুর্লভ স্কোরবোর্ড সংযোজিত হয়েছে, যার অনেকগুলোর ছবি লেখক নিজেই তুলেছেন।

অনুষ্ঠানে বক্তাদের কেউ কেউ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন, কেন তারা এতদিন দেশের ক্রিকেটের ইতিহাস সংরক্ষণ করেনি। তাঁদের মতে, বইটি ইতিহাসের বাঁকে পড়ে থাকা আসল ইতিহাসকে নতুন করে সামনে এনেছে।

১৯৩৩ সালের নভেম্বরে কুমিল্লায় জন্মগ্রহণকারী লুৎফুর রহমান মাখনের শৈশব কেটেছে ময়মনসিংহে। শহরের পন্ডিতপাড়া অ্যাথলেটিক ক্লাবে ক্রিকেটে হাতেখড়ি। পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকে ঢাকার প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে অভিষেক। পাকিস্তানের প্রধান ঘরোয়া প্রতিযোগিতা কায়দে আজম ট্রফি ঢাকায় প্রথম আয়োজিত হলে পূর্ব পাকিস্তান দলের হয়ে মাঠে নামেন। ১৯৫৭-৫৮ মৌসুমে তাঁর নেতৃত্বে ইস্ট জোন চ্যাম্পিয়ন হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবেক ক্রিকেটার দুলাল হোসেনের সার্বিক সহযোগিতায় সৌম্য প্রকাশনী বইটি প্রকাশ করেছে। ক্রীড়া লেখক ইকরামউজ্জমান ও সাবেক ক্রিকেটার শহীদুল আলম রতনও অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।