২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সকালে নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে যখন ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা চালানো হচ্ছিল, তখন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হামিদ দাবাশি তাঁর আপার ওয়েস্ট সাইডের নিরিবিলি বাসায় ছিলেন। ল্যান্ডফোনে এক বন্ধুর উদ্বেগের কথা শুনে টেলিভিশন চালু করতেই তিনি দেখতে পান, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে বিমান আঘাত হেনেছে এবং ভবন দুটি ধসে পড়ছে। এই দৃশ্য তাঁকে সেই বছরেরই ১৫ এপ্রিলের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন তিনি তাঁর বড় মেয়েকে নিয়ে উত্তর টাওয়ারের 'উইন্ডোজ অন দ্য ওয়ার্ল্ড' রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলেন।

হামিদ দাবাশি স্মৃতিচারণ করেন, হামলার পর তিনি যখন শহরের কেন্দ্রের দিকে হাঁটছিলেন, তখন পুরো নিউইয়র্ক এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবে ছিল। ব্রডওয়ের রাস্তাঘাট একদম ফাঁকা। তিনি লক্ষ্য করেন, কিছু জাপানি পর্যটক ধ্বংসস্তূপের ধুলা সংগ্রহ করছেন, যে ধুলার সাথে মিশে ছিল ইট, সিমেন্ট এবং অসংখ্য মানুষের অপূর্ণ স্বপ্ন। এই পরিস্থিতি তাঁকে ওমর খৈয়ামের কবিতার পঙ্ক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে জীবনের নশ্বরতা এবং সবশেষে ধুলায় মিশে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ঘটনার পরদিন তাঁর ক্লাসের শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরির সিঁড়িতে রঙের মাধ্যমে তাদের ভয় ও শোক প্রকাশ করছিল। অধ্যাপক দাবাশি মনে করেন, এই শোক ছিল মূলত জীবিতদের জন্য, যা জীবনকে মহৎভাবে বেঁচে থাকার এক পবিত্র আচার। তবে তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আমেরিকানরা এই শোকের মুহূর্ত থেকে দ্রুত বেরিয়ে এসে এক অস্পষ্ট শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে শুরু করে। যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠায় মানুষের শান্ত হয়ে চিন্তা করার এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষত অনুভব করার সুযোগ হারিয়ে যায়।

এই প্রসঙ্গে তিনি ফরাসি দার্শনিক জ্যাক দেরিদার সঙ্গে তাঁর এক কথোপকথনের কথা উল্লেখ করেন। দেরিদা 'রাজনৈতিক শোক' নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। দাবাশি দেরিদাকে প্রশ্ন করেছিলেন, শোকের এই রাজনীতি কি শেষ পর্যন্ত রাজনীতির প্রকৃত শোকের সম্ভাবনাকে রুদ্ধ করে দেবে? লেখকের মতে, 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' এত দ্রুত এবং সহিংসভাবে শুরু হয়েছিল যে, শোকের মানবিক দিকটি ঢাকা পড়ে যায় এবং তা কেবল বাহ্যিক প্রতিশোধের রূপ নেয়।

হামিদ দাবাশি আফগানিস্তান ও ইরাকের পরিস্থিতির কথা টেনে বলেন, আমেরিকানরা যে যন্ত্রণা অনুভব করেছিল, তার চরম পরিণতি ভোগ করেছে আফগান ও ইরাকিরা। তিনি উল্লেখ করেন, ২০০১ সালের মে মাসে মোহসেন মাখমালবাফের 'কান্দাহার' চলচ্চিত্রটি তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখিয়েছিলেন যাতে নিউইয়র্ক ও কান্দাহারের মধ্যে একটি সংহতি তৈরি হয়। তবে মার্কিন প্রশাসনের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এমনকি প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী রিচার্ড ফক-এর মতো ব্যক্তিরাও আফগানিস্তানে আক্রমণকে ন্যায়সংগত মনে করেছিলেন, যদিও পরে তিনি যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কা করেছিলেন।

অধ্যাপক দাবাশির মতে, আমেরিকার ইতিহাসে অনেক জাতীয় ট্র্যাজেডি থাকলেও, সামরিক উন্মাদনা এবং প্রতিশোধের নেশা গভীর শূন্যতাকে পূরণ করে না বরং আড়াল করে। তিনি মনে করেন, যতক্ষণ না একজন আফগান বা ইরাকি শিশুর জীবনকে একজন আমেরিকান শিশুর জীবনের সমান মূল্যবান মনে করা হবে, ততক্ষণ এই জাতি আদর্শ হতে পারবে না। প্রতিশোধ ক্ষত সারায় না, বরং তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। বর্তমানে ৯/১১ একটি প্রতীকী ইতিহাসে পরিণত হয়েছে এবং ধীরে ধীরে বিস্মৃতির দিকে যাচ্ছে, যা একসময় এই জাতিকে পৃথিবীর সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের ভয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।